নবজাতকের টিকার তালিকা জানুন, সময়মতো টিকা দিন। সন্তানের জন্ম প্রতিটি পরিবারের জন্য এক অসীম আনন্দের মুহূর্ত। একটি নবজাতক যখন পৃথিবীতে আসে, তখন তার রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা (Immune System) থাকে অত্যন্ত দুর্বল ও অপরিণত। পরিবেশের নানা ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও সংক্রামক ব্যাধির মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা শিশুর শরীরে প্রথম দিকে পর্যাপ্ত থাকে না। এই প্রাণঘাতী রোগগুলোর হাত থেকে শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক ও সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সঠিক সময়ে সঠিক টিকা (Vaccination) প্রদান করা।
আরও জানুনঃ ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রতিরোধের উপায় – আপডেট ২০২৬
বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI – Expanded Programme on Immunization) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) দিকনির্দেশনায় দেশের প্রতিটি শিশুকে বিনামূল্যে সংক্রামক ব্যাধি থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে। সঠিক সময়ে টিকাদানের মাধ্যমে প্রতি বছর লাখ লাখ শিশুর অকাল মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব রোধ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে অনেক নতুন মা-বাবাই সঠিক তথ্যের অভাবে কিংবা সঠিক সময়সূচী না জানার কারণে টিকাদানে দেরি করে ফেলেন বা কোনো কোনো ডোজ বাদ দিয়ে ফেলেন।
আরও পড়ুনঃ ৭ দিনে ওজন কমানোর টেকনিক:মাত্র এক সপ্তাহে মেদ কমান ২০টি কার্যকর উপায়ে
এই পূর্ণাঙ্গ সহায়িকায় আমরা নবজাতকের জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে ১৫ মাস বয়স পর্যন্ত প্রতিটি টিকার বিবরণ, দেওয়ার নিয়ম, কাজের ধরণ, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অভিভাবকদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যগত পরামর্শ বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. নবজাতকের টিকাদান কেন অপরিহার্য?
জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস শিশু তার মায়ের দুধ থেকে কিছু প্রাকৃতিক ইমিউনিটি বা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে। তবে এই সাময়িক সুরক্ষা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। শিশু যত বড় হতে থাকে, তার শরীরে স্থায়ী ইমিউনিটি গড়ে তোলা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুনঃ গ্যাস্টিক সমস্যা হলে কী খাবেন আর কী খাবেন না
- রোগ থেকে সুরক্ষা: ক্ষতিকর ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ যেমন—যক্ষ্মা, পোলিও, ডায়রিয়া, হেপাটাইটিস, নিউমোনিয়া ও হাম প্রতিরোধ করে।
- মৃত্যুহার হ্রাস: অতীতে শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ছিল প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগসমূহ। সময়মতো টিকাদানে শিশু মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে।
- জটিলতা ও পঙ্গুত্ব রোধ: পোলিও বা মেনিঞ্জাইটিসের মতো রোগ শিশুকে আজীবনের জন্য পঙ্গু বা মানসিক প্রতিবন্ধী করে দিতে পারে। টিকা এই ঝুঁকি সম্পূর্ণ নির্মূল করে।
- সামাজিক নিরাপত্তা (Herd Immunity): একটি সমাজের বেশিরভাগ শিশু টিকাপ্রাপ্ত হলে সেই সমাজে মারণব্যাধির বিস্তার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
২. ইপিআই (EPI) অনুযায়ী বয়সভিত্তিক টিকার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ
বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান ইপিআই (EPI) কর্মসূচির আওতায় মূলত ১১টি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধে টিকা প্রদান করা হয়। নিচে শিশুর বয়স অনুযায়ী প্রতিটি টিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হলো:
ক) জন্মলগ্নে বা যত দ্রুত সম্ভব
১. বিসিজি (BCG – Bacillus Calmette–Guérin)
- সুরক্ষাকৃত রোগ: যক্ষ্মা (Tuberculosis বা TB)। শিশুদের যক্ষ্মা এবং যক্ষ্মাজনিত মেনিঞ্জাইটিস থেকে রক্ষা করে।
- দেওয়ার সময়: জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব (সাধারণত হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্রের আগেই বা প্রথম এক সপ্তাহের মধ্যে)।
- প্রয়োগের স্থান ও মাত্রা: বাম বাহুর ওপরের অংশে চামড়ার ঠিক নিচে (Intradermal) ০.০৫ মি.লি.।
- টিকা পরবর্তী প্রতিক্রিয়া:
- টিকা দেওয়ার ২ থেকে ৩ সপ্তাহ পর ইনজেকশনের স্থানটি লাল হয়ে ছোট ফুসকুড়ি বা গুটলির মতো ফুলে ওঠে।
- পরবর্তীতে এতে সামান্য পুঁজ জমা হতে পারে এবং একপর্যায়ে এটি ফেটে গিয়ে ঘা তৈরি হয়।
- ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যে ঘাটি শুকিয়ে গিয়ে সেখানে একটি স্থায়ী ছোট দাগ পড়ে।
- অভিভাবকদের করণীয়: এই ঘা দেখে ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। এটি টিকার স্বাভাবিক কার্যকারিতার লক্ষণ। ঘায়ে কোনো মলম, অ্যান্টিসেপটিক, বা ব্যান্ডেজ লাগানো কঠোরভাবে নিষেধ। স্থানটি স্বাভাবিকভাবে শুকোতে দিতে হবে।
খ) ৬ সপ্তাহ বয়স পূর্ণ হলে (১ম ডোজ)
শিশুর বয়স দেড় মাস বা ৬ সপ্তাহ পূর্ণ হলে বেশ কয়েকটি টিকা একসাথে দেওয়া হয়।
আরও পড়ুনঃ গ্যাস্ট্রিক সমস্যা দূর করার ঘরোয়া উপায় – দ্রুত আরাম পেতে এখনই জানুন
১. পেন্টাভেলেন্ট-১ (Pentavalent Vaccine – 1)
এটি একটি সম্মিলিত ৫-ইন-১ ইনজেকশন, যা একসাথে ৫টি মারাত্মক রোগ প্রতিরোধ করে:
- ডিফথেরিয়া (Diphtheria): গলা ও শ্বাসপ্রশ্বাসের মারাত্মক সংক্রমণ।
- কাশি/পারটুসিস (Whooping Cough): তীব্র হুপিং কাশি।
- ধনুর্বঙ্কার (Tetanus): স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি।
- হেপাটাইটিস-বি (Hepatitis B): লিভারের দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণ বা জন্ডিস।
- হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-বি (Hib): এর ফলে শিশুদের মেনিঞ্জাইটিস (মস্তিষ্কের ঝিল্লির প্রদাহ) ও নিউমোনিয়া হতে পারে।
প্রয়োগের স্থান: শিশুর বাম উরুর বা রানের মাংসপেশিতে (Intramuscular) ০.৫ মি.লি.।
২. ওপিভি-১ (OPV-1 – Oral Polio Vaccine)
- সুরক্ষাকৃত রোগ: পোলিওমাইলাইটিস বা পোলিও রোগ, যা শিশুকে আজীবনের জন্য পঙ্গু করে দেয়।
- প্রয়োগের স্থান: মুখে খাওয়ার মাধ্যমে (২ ফোঁটা)।
৩. আইপিভি-১ (IPV-1 – Inactivated Polio Vaccine)
- সুরক্ষাকৃত রোগ: পোলিও রোগের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ও শক্তিশালী ইমিউনিটি তৈরি করে।
- প্রয়োগের স্থান: শিশুর ডান উরুর চামড়ার ঠিক নিচে বা মাংসপেশিতে ০.১/০.৫ মি.লি. (ইনজেকশন)।
৪. পিসিভি-১ (PCV-1 – Pneumococcal Conjugated Vaccine)
- সুরক্ষাকৃত রোগ: নিউমোকক্কাল ব্যাকটেরিয়াজনিত নিউমোনিয়া ও রক্তের সংক্রমণ (Sepsis)।
- প্রয়োগের স্থান: শিশুর ডান উরুর/রানের মাংসপেশিতে ০.৫ মি.লি.।
গ) ১০ সপ্তাহ বয়স পূর্ণ হলে (২য় ডোজ)
প্রথম ডোজের ঠিক ৪ সপ্তাহ পর (শিশুর আড়াই মাস বয়সে) নিম্নলিখিত টিকার দ্বিতীয় ডোজ প্রদান করা হয়:
আরও পড়ুনঃ টাইফয়েড জ্বর: কারণ, উপসর্গ, রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
- পেন্টাভেলেন্ট-২ (Pentavalent-2): বাম উরুর মাংসপেশিতে।
- ওপিভি-২ (OPV-2): মুখে খাওয়ার ২ ফোঁটা ড্রপ।
- পিসিভি-২ (PCV-2): ডান উরুর মাংসপেশিতে।
(দ্রষ্টব্য: ১০ সপ্তাহ বয়সে সাধারণত IPV ইনজেকশন দেওয়া হয় না।)
ঘ) ১৪ সপ্তাহ বয়স পূর্ণ হলে (৩য় ডোজ)
দ্বিতীয় ডোজের ৪ সপ্তাহ পর (শিশুর সাড়ে তিন মাস বয়সে) প্রাথমিক টিকার কোর্স সম্পূর্ণ করার জন্য ৩য় ডোজ দেওয়া হয়:
আরও পড়ুনঃ বাতের ব্যথা থেকে মুক্তি চাইছেন? রইল কিছু ঘরোয়া টোটকা
- পেন্টাভেলেন্ট-৩ (Pentavalent-3): বাম উরুর মাংসপেশিতে।
- ওপিভি-৩ (OPV-3): মুখে খাওয়ার ২ ফোঁটা ড্রপ।
- আইপিভি-২ (IPV-2): ইনজেকশনের পোলিও টিকা (২য় ডোজ)।
- পিসিভি-৩ (PCV-3): ডান উরুর মাংসপেশিতে (৩য় ডোজ)।
ঙ) ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে (১ম ডোজ)
১. এমআর-১ (MR-1 – Measles & Rubella)
- সুরক্ষাকৃত রোগ: হাম (Measles) ও রুবেলা (Rubella)। হাম শিশুদের ত্বকে লালচে র্যাশ, তীব্র জ্বর ও নিউমোনিয়া ঘটাতে পারে। রুবেলা সংক্রমণও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।
- দেওয়ার সময়: ৯ মাস বয়স পূর্ণ হলে (৯ মাস একদিন বয়স থেকে দেওয়া যায়)।
- প্রয়োগের স্থান: ডান বাহুর চামড়ার নিচে ০.৫ মি.লি.।
(অনেক সময় সরকারি নির্দেশনানুযায়ী এই সময়ে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুলও খাওয়ানো হয়ে থাকে।)
চ) ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হলে (২য় ডোজ)
১. এমআর-২ (MR-2)
আরও পড়ুনঃ পেঁপে খাওয়ার ১০ টি স্বাস্থ্য উপকারিতা: জানুন কেন প্রতিদিন খাওয়া উচিত
- সুরক্ষাকৃত রোগ: হাম ও রুবেলার বুস্টার डोज, যা আজীবনের জন্য দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করে।
- দেওয়ার সময়: ১৫ মাস বয়স পূর্ণ হলে।
- প্রয়োগের স্থান: বাম বা ডান বাহুর চামড়ার নিচে ০.৫ মি.লি.।
৩. শিশুর বয়স অনুযায়ী টিকার সহজ সময়সূচী (Table)
সহজে তথ্য বোঝার জন্য ও তারিখ মনে রাখার জন্য নিচের ছকটি ব্যবহার করতে পারেন:
| শিশুর বয়স | টিকার নাম | প্রতিরোধযোগ্য রোগসমূহ | প্রয়োগের ধরণ |
| জন্মের পরপরই | বিসিজি (BCG) | যক্ষ্মা (TB) | চামড়ার নিচে (বাম বাহু) |
| ৬ সপ্তাহ (দেড় মাস) | পেন্টাভেলেন্ট-১, OPV-১, IPV-১, PCV-১ | ৯টি রোগ (পোলিও, নিউমোনিয়া, হেপাটাইটিস-বি সহ) | মুখে ড্রপ + ২ উরুতে ইনজেকশন |
| ১০ সপ্তাহ (আড়াই মাস) | পেন্টাভেলেন্ট-২, OPV-২, PCV-২ | পূর্ববর্তী রোগের ২য় মাত্রা | মুখে ড্রপ + ২ উরুতে ইনজেকশন |
| ১৪ সপ্তাহ (সাড়ে ৩ মাস) | পেন্টাভেলেন্ট-৩, OPV-৩, IPV-২, PCV-৩ | পূর্ববর্তী রোগের ৩য় মাত্রা | মুখে ড্রপ + ২ উরুতে ইনজেকশন |
| ৯ মাস পূর্ণ হলে | এমআর-১ (MR-1) | হাম ও রুবেলা | চামড়ার নিচে (ডান বাহু) |
| ১৫ মাস পূর্ণ হলে | এমআর-২ (MR-2) | হাম ও রুবেলা (বুস্টার ডোজ) | চামড়ার নিচে (বাহু) |
৪. অপশনাল বা প্রাইভেট টিকাসমূহ (Private Vaccines)
সরকারি ইপিআই (EPI) শিডিউলের বাইরেও বেশ কিছু আধুনিক ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত টিকা রয়েছে, যেগুলো বেসরকারি হাসপাতাল বা শিশু বিশেষজ্ঞদের ক্লিনিকে পাওয়া যায়। বাজেট ও ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এগুলো দেওয়া যেতে পারে:
আরও পড়ুনঃ টাইফয়েড ভ্যাকসিনের জন্য নিবন্ধন করুন
১. রোটাবাইরাস ভ্যাকসিন (Rotavirus Vaccine):
- কাজ: শিশুদের ডায়রিয়া ও ডিহাইড্রেশন প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর।
- সময়: ৬ সপ্তাহ বয়স থেকে শুরু করে মুখে খাওয়ার ২ বা ৩টি ডোজ দেওয়া হয়।
২. চিকেনপক্স/জলবসন্ত (Chickenpox Vaccine):
- কাজ: জলবসন্তের সংক্রমণ ও জটিলতা প্রতিরোধ করে।
- সময়: ১৫ মাস বা তার বেশি বয়সে ১ম ডোজ, পরে বুস্টার।
৩. হেপাটাইটিস-এ ভ্যাকসিন (Hepatitis-A Vaccine):
- কাজ: খাদ্য ও পানিবাহিত হেপাটাইটিস-এ (জন্ডিস) থেকে রক্ষা করে।
- সময়: ১২ মাস বা ১ বছর বয়সের পর ২ ডোজে দেওয়া হয়।
৪. ইনফ্লুয়েঞ্জা/ফ্লু ভ্যাকসিন (Influenza/Flu Shot):
- কাজ: মৌসুমী ভাইরাল জ্বর, সর্দি-কাশি ও ফ্লু প্রতিরোধে কাজ করে।
- সময়: ৬ মাস বয়সের পর থেকে প্রতি বছর শীতের আগে ১টি করে ডোজ।
৫. টাইফয়েড ভ্যাকসিন (Typhoid Vaccine):
- কাজ: টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধ করে।
- সময়: সাধারণত ৬ মাস (Conjugate vaccine) বা ২ বছর বয়সের পর দেওয়া যায়।
৫. টিকাদান পরবর্তী সাধারণ প্রতিক্রিয়া ও সঠিক যত্ন
ইনজেকশন দেওয়ার পর শিশুর শরীরে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা যাওয়া খুবই স্বাভাবিক। এটি প্রমাণ করে যে শিশুর ইমিউন সিস্টেম টিকার সাথে প্রতিক্রিয়া করে অ্যান্টিবডি তৈরি করছে।
সম্ভাব্য সাধারণ সমস্যা:
- হালকা থেকে মাঝারি জ্বর (১০০°-১০১° ফারেনহাইট)।
- ইনজেকশনের জায়গা লাল হওয়া, ফুলে যাওয়া বা শক্ত হয়ে যাওয়া।
- স্থানটিতে চাপ লাগলে শিশুকন্যা বা শিশুসন্তানের কেঁদে ওঠা।
- শিশু অতিরিক্ত খিটখিটে হওয়া, ঘন ঘন কাঁদা বা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটা।
- সামান্য অরুচি বা স্তন্যপানে অনিচ্ছা।
অভিভাবকদের জন্য প্রয়োজনীয় করণীয়:
- জ্বর ও ব্যথার চিকিৎসা: শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুটির ওজন মেপে সঠিক মাত্রায় প্যারাসিটামল ড্রপ বা সিরাপ দিন। মনগড়া মাত্রায় বা অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ দেবেন না।
- ঠান্ডা সেক দেওয়া: ইনজেকশনের ফোলা জায়গায় একটি পরিষ্কার সুতি কাপড়ে ঠান্ডা পানি ভিজিয়ে আলতো করে চেপে চেপে সেক দিন। কখনোই সরাসরি বরফ ঘষবেন না।
- পর্যাপ্ত পানীয় বা স্তন্যপান: শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ বা তরল খাবার খাওয়ান যাতে তার শরীর হাইড্রেটেড থাকে।
- আরামদায়ক পোশাক: শিশুকে পাতলা, সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরিয়ে রাখুন। বেশি কাপড় বা কাঁথা দিয়ে জড়িয়ে রাখবেন না।
কখন জরুরিভিত্তিতে ডাক্তার দেখাবেন?
যদি শিশুর জ্বর ১০২° ফারেনহাইটের বেশি থাকে এবং ২ দিনের বেশি স্থায়ী হয়, শিশু অনবরত অলস বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে, অতিরিক্ত কান্নাকাটি বন্ধ না হয়, অথবা খিঁচুনি দেখা দেয়—তবে কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যান।
৬. টিকাদান নিয়ে বহুল প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও বাস্তব তথ্য
১. ভুল ধারণা: শিশুর সামান্য ঠান্ডা, সর্দি বা কাশি থাকলে টিকা দেওয়া যাবে না।
- বাস্তবতা: সাধারণ সর্দি-কাশি, সামান্য কাশি বা মৃদু জ্বরে টিকা দেওয়া সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে তীব্র জ্বর বা গুরুতর অসুস্থতা থাকলে ডাক্তার দেখিয়ে পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. ভুল ধারণা: একটি ডোজের তারিখ পার হয়ে গেলে আবার নতুন করে ১ম ডোজ থেকে শুরু করতে হয়।
- বাস্তবতা: কখনোই ১ম ডোজ থেকে নতুন করে শুরু করতে হয় না। যে ডোজটি বাদ পড়েছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে সেখান থেকেই পরবর্তী ডোজ সম্পন্ন করতে হয়।
ভুল ধারণা: একই দিনে এতগুলো ইনজেকশন দিলে শিশু সহ্য করতে পারবে না।
- বাস্তবতা: বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত যে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা একই সাথে একাধিক টিকা গ্রহণ ও অ্যান্টিবডি তৈরি করতে পুরোপুরি সক্ষম।
৪. ভুল ধারণা: টিকা দিলে শিশু বড় হয়ে প্রজনন ক্ষমতা বা বন্ধ্যাত্বের সমস্যায় ভুগবে।
- বাস্তবতা: এটি একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন গুজব। বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ ছোটবেলায় টিকা নিয়ে প্রাপ্তবয়সে স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন করছেন।
৭. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: শিশুর টিকা দেওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ পার হয়ে গেলে করণীয় কী?
উত্তর: নির্ধারিত তারিখ পার হয়ে গেলেও দুশ্চিন্তার কিছু নেই। দ্রুততম সময়ে আপনার নিকটস্থ সরকারি টিকাদান কেন্দ্র বা হাসপাতালের ইপিআই ব্লকে যোগাযোগ করুন। স্বাস্থ্যকর্মী বা ডাক্তার শিশুর বয়স হিসাব করে পরবর্তী তারিখ ও ডোজ সমন্বয় করে দেবেন।
প্রশ্ন ২: টিকা কার্ড হারিয়ে গেলে কীভাবে টিকা দেব?
উত্তর: যে স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে আপনার শিশু নিয়মিত টিকা নিচ্ছিল, সেখানে যান। সরকারি রেজিস্টার খাতায় শিশুর নাম, মা-বাবার নাম ও পূর্ববর্তী টিকার রেকর্ড সংরক্ষিত থাকে। তারা রেজিস্টার দেখে আপনাকে একটি নতুন কার্ড প্রদান করবে।
প্রশ্ন ৩: প্রিম্যাচিউর বা কম ওজনের শিশুদের ক্ষেত্রে টিকাদানের নিয়ম কী?
উত্তর: নির্ধারিত সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুর মতোই প্রিম্যাচিউর বা কম ওজনের শিশুদের স্বাভাবিক বয়স (Chronological Age) অনুযায়ী সঠিক শিডিউলেই টিকা দিতে হয়। ব্যতিক্রম ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
প্রশ্ন ৪: বিসিজি টিকা দেওয়ার পর কোনো দাগ বা ঘা না হলে কি আবার দিতে হবে?
উত্তর: না, সব শিশুর ত্বক একই রকম প্রতিক্রিয়া দেখায় না। প্রায় ১০-১৫% শিশুর ক্ষেত্রে কোনো ঘা বা স্থায়ী দাগ না-ও হতে পারে। ঘা না হলেও টিকার কার্যকারিতা কমে যায় না এবং পুনরায় বিসিজি দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
উপসংহার
নবজাতকের টিকার তালিকা জানুন, সময়মতো টিকা দিন। একটি শিশুর সুস্থ, নিরোগ ও দীর্ঘ জীবনের ভিত্তি তৈরি হয় তার শৈশবের সঠিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে। আর এই স্বাস্থ্যসেবার প্রথম ও প্রধান ধাপ হলো সময়সূচী মেনে সবকটি টিকা প্রদান করা। সামান্য অবহেলা বা অসচেতনতার কারণে যেন কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রতিটি অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
আপনার শিশুর জন্মের পরপরই নিকটস্থ ইপিআই কেন্দ্র থেকে টিকাদান কার্ড সংগ্রহ করুন এবং সবকটি ডোজ সঠিক সময়ে দেওয়া সম্পন্ন করুন। সময়মতো টিকাদানই আপনার সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যতের সেরা উপহার।
সতর্কতাঃ সকল তথ্য অনলাইন থেকে সংগৃহীত। চিকিৎসার জন্য অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন। ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত কোনো ঔষধ সেবন করবেন না এমন কি কোনো টিকা প্রদান করবেন না।
আরও জানুনঃ
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। shikkhatech24.com ওয়েবসাইটে আপনাকে স্বাগতম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য , প্রযুক্তি, টেক আপডেট, এসএসসি ও এইচএসসি সাজেশন, চাকরির খবর, উদ্যোক্তা, খাবার ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি নানা বিষয় সম্পর্কে নিত্যনতুন তথ্য জানতে ওয়েবসাইটটি সাবস্ক্রাইব করুন এবং অন্যদের সাথে শেয়ার করুন।
