মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬ | বিয়ে ও ডিভোর্স এর আপডেট খরচ

মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬: বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও পারিবারিক জীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায় হলো বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ (তালাক)। এটি কেবল দু’টি মানুষের শারীরিক বা সামাজিক বন্ধন নয়, বরং একটি আইনি ও ধর্মীয় চুক্তি। আইনসম্মতভাবে বিয়ে বা তালাক সম্পাদনের জন্য ‘নিকাহ রেজিস্ট্রার’ বা কাজীর মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে দেনমোহরের হার বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কাজীদের সার্ভিস চার্জ নিয়ে নানা আলোচনার কারণে সাধারণ মানুষের মনে একটি বড় প্রশ্ন জেগেছে “২০২৬ সালে এসে দেশে কি বিয়ে ও ডিভোর্স রেজিস্ট্রেশনের খরচ সত্যি সত্যি বেড়ে গেল?”

আরও পড়ুনঃ মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন 

এই নিবন্ধে আমরা ২০২৬ সালের সরকারি আইনি কাঠামো, কাজী ফি, রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত আইন, অতিরিক্ত খরচের পেছনের কারণ এবং এর সামাজিক-আইনি প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

পোস্ট সূচিপত্র

১. মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশনের আইনি ভিত্তি

বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের ‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (রেজিস্ট্রেশন) আইন’ অনুযায়ী যেকোনো বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রি করা আইনিভাবে বাধ্যতামূলক। পরবর্তীতে সরকার ২০০৯, ২০১২ এবং সর্বশেষ সেশনের বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের (কাজী) ফি ও কাজের পরিধি পুনঃনির্ধারণ করে।

আরও পড়ুনঃ অনাপত্তি পত্র লেখার নিয়ম

আইন অনুযায়ী, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন না করা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নিবন্ধন না করলে ভবিষ্যতে:

  • দেনমোহর আদায়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
  • ভরণপোষণ (খোরপোষ) দাবি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
  • সন্তানের পিতৃত্ব ও উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকার নিয়ে আইনি সংকট দেখা দেয়।
  • পাসপোর্টে স্বামীর নাম অন্তর্ভুক্তকরণ, ভিসা বা বিদেশ যাত্রার সময় আইনি প্রমাণের অভাব ঘটে।

২. ২০২৬ সালে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফি (কাবিননামা ফি)

মুসলিম বিয়েতে ফি মূলত নির্ধারিত হয় ‘দেনমোহর’ (Mahr)-এর অঙ্কের ওপর ভিত্তি করে। দেনমোহর যত বেশি হবে, রেজিস্ট্রেশন ফি-ও সেই অনুপাতে বাড়বে। সরকারি গেজেট ও আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত হিসাব নিচে তুলে ধরা হলো:

আরও পড়ুনঃ সহকারী শিক্ষক পদে আবেদন পত্র লেখার নিয়ম ২০২৬

দেনমোহরের পরিমাণসরকারি রেজিস্ট্রেশন ফি এর হারউদাহরণের মাধ্যমে হিসাব
প্রথম ৫,০০,০০০ (পাঁচ লাখ) টাকা পর্যন্তপ্রতি ১,০০০ টাকায় ১৪ টাকা

১ লাখ টাকা দেনমোহরে = ১,৪০০ টাকা

 

৫ লাখ টাকা দেনমোহরে = ৭,০০০ টাকা

৫,০০,০০০ টাকার অতিরিক্ত অংশের জন্যপরবর্তী প্রতি ১,০০,০০০ টাকায় ১০০ টাকা১০ লাখ টাকা দেনমোহরে = ৭,০০০ + (৫ × ১০০) = ৭,৫০০ টাকা
সর্বনিম্ন ফি (Minimum Fee)যেকোনো দেনমোহরের ক্ষেত্রে২০০ টাকা

উদাহরণ সহ হিসাব:

যদি কোনো বিয়েতে দেনমোহর ধার্য করা হয় ১৫ লাখ টাকা, তবে সরকারি ফি হবে:

  1. প্রথম ৫ লাখ টাকার জন্য (১৪ × ৫০০) = ৭,০০০ টাকা
  2. বাকি ১০ লাখ টাকার জন্য (১০০ × ১০) = ১,০০০ টাকা
  3. মোট সরকারি রেজিস্ট্রি ফি = ৮,০০০ টাকা

৩. ২০২৬ সালে তালাক (ডিভোর্স) রেজিস্ট্রেশন ফি

বিবাহের মতো তালাক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট আইনি নির্দেশিকা রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ চাকরির দরখাস্ত লেখার সঠিক নিয়ম
  • তালাক নিবন্ধনের নির্দিষ্ট ফি: বর্তমানে প্রতি তালাক নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি ১,০০০ টাকা।
  • ফর্ম বা বালাম ফি: তালাক নামার অফিসিয়াল কপি (বি, সি বা ডি ফর্ম) এবং প্রতিলিপির জন্য অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১০০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।

৪. অন্যান্য আনুষঙ্গিক ও প্রাসঙ্গিক খরচ

আইনে নির্ধারিত সরকারি মূল ফির বাইরে কিছু আনুষঙ্গিক খরচ যুক্ত হয়:

  1. কমিশন ফি (কাজী সাহেবের যাতায়াত):

    যদি কাজী সাহেবকে নিজের অফিস বা কাজী অফিসের বাইরে গিয়ে (যেমন: কোনো কমিউনিটি সেন্টার, রেস্তোরাঁ বা কনের বাড়িতে) বিবাহ রেজিস্ট্রি করতে হয়, তবে তিনি আইনিভাবে কমিশন ফি দাবি করতে পারেন।

  • নির্দিষ্ট কমিশন ফি: ৫০ টাকা।
  • যাতায়াত খরচ: প্রতি কিলোমিটারের জন্য আনুমানিক ১০ টাকা বা প্রকৃত যাতায়াত ভাড়া।
  1. নকল বা অনুলিপি (Certified Copy) ফি:

    কাবিননামা বা তালাকনামার সার্টিফাইড কপির জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা।

৫. দেশে কি সত্যি বিয়ে ও ডিভোর্সের খরচ বেড়েছে?

অনেকের ধারণা ২০২৬ সালে সরকার হঠাৎ করে বিয়ের রেজিস্ট্রি ফি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে প্রকৃত আইনি সত্য হলো- সরকার সম্প্রতি মূল ফি স্কেলে কোনো বড় ধরনের আকস্মিক বৃদ্ধি ঘটায়নি। তবুও কেন সাধারণ মানুষের পকেট থেকে বেশি টাকা খসছে? এর পেছনে কয়েকটি বাস্তবসম্মত কারণ রয়েছে:

মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬
মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি ২০২৬

ক. সামাজিক প্রতিযোগিতা ও দেনমোহরের পরিমাণ বৃদ্ধি

অতীতে গড়ে ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা দেনমোহরে বিয়ে সম্পাদন হতো। কিন্তু বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতে ৫ লাখ, ১০ লাখ, এমনকি ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত দেনমোহর ধার্য করার প্রবণতা বেড়েছে। যেহেতু দেনমোহরের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে ফি নির্ধারিত হয়, তাই স্বাভাবিকভাবেই মোট রেজিস্ট্রেশন ফি-র অঙ্ক দাঁড়িয়েছে অনেক বেশি।

খ. কাজী সাহেবের ‘সার্ভিস চার্জ’ ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়

আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ফি টেবিল কাজী অফিসে টানিয়ে রাখার নিয়ম থাকলেও মাঠপর্যায়ে অনেক কাজী বা তাদের প্রতিনিধিরা (সহকারী কাজী) আইন মানেন না।

  • অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আইনি অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে সরকারি ফির চেয়ে ২ গুণ থেকে ৩ গুণ বেশি টাকা দাবি করা হয়।
  • “কাজী অফিসের বকশিশ”, “রেজিস্ট্রি খাতার খরচ”, “প্রসেসিং ফি” ইত্যাদি ভুয়া অজুহাতে অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হয়।

গ. ভুয়া কাজী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য

অনেক বিয়েতে দেখা যায় অসাধু ঘটক বা ভুয়া কাজীরা গিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি করান এবং মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। পরবর্তীতে দেখা যায় সেই বিয়ের কোনো সরকারি বালাম বইয়ে নিবন্ধনই হয়নি।

৬. সিটি কর্পোরেশনের অতিরিক্ত ট্যাক্স বিতর্ক

গত কয়েক বছরের মধ্যে বিয়ে রেজিস্ট্রেশন নিয়ে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (DSCC) একটি সিদ্ধান্ত। তারা বিয়ের ওপর অতিরিক্ত কর বা ট্যাক্স বসানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।

তবে নাগরিক সমাজের তীব্র প্রতিবাদ এবং পরবর্তী আইনি আইনি পর্যালোচনার পর এই ধরনের অতিরিক্ত সিটি কর্পোরেশন ট্যাক্স প্রয়োগ প্রক্রিয়াকে স্থগিত বা বাতিল করা হয়। ফলে বর্তমানে নাগরিকদের শুধুমাত্র আইন মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত ফি-ই প্রদান করতে হয়।

৭. সাধারণ নাগরিক হিসেবে আপনার করণীয় ও সচেতনতা

বিয়ে বা ডিভোর্স রেজিস্ট্রেশনের সময় অতিরিক্ত অর্থ প্রদান ও প্রতারণা থেকে বাঁচতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত:

  1. আইনি ফি সম্পর্কে নিজে সচেতন থাকুন: বিয়ে বা ডিভোর্সের আগে দেনমোহরের হিসাব অনুযায়ী সরকারি ফি কত হয় তা নিজে হিসাব করে নিন।

  2. অফিসিয়াল রসিদ (Money Receipt) বুঝে নিন: কাজী সাহেবকে টাকা পরিশোধ করার পর অবশ্যই সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত মূল ক্যাশ মেমো বা রসিদ সংগ্রহ করুন। রসিদে কত টাকা লেখা হয়েছে তা যাচাই করুন।

  3. কাজী সাহেবের লাইসেন্স পরীক্ষা করুন: যিনি বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধিত কাজী কি না তা নিশ্চিত হয়ে নিন। এক এলাকার কাজী অন্য এলাকায় গিয়ে নিবন্ধনের কাজ করলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।

  4. অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে অভিযোগ জানান: কোনো কাজী নির্ধারিত ফি-র অতিরিক্ত টাকা দাবি করলে এবং রসিদ দিতে অস্বীকৃতি জানালে স্থানীয় জেলা রেজিস্ট্রি অফিস বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) এর নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করা যায়।

মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন ফি সাধারণ জিজ্ঞাসা

প্রশ্ন ১: ২০২৬ সালে ১ লাখ টাকা দেনমোহরে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফি কত?

উত্তর: সরকারি হিসাব অনুযায়ী প্রথম ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রতি হাজার টাকা দেনমোহরের জন্য ১৪ টাকা ফি দিতে হয়। সেই হিসেবে ১ লাখ টাকা দেনমোহরে সরকারি ফি হলো ১,৪০০ টাকা।

প্রশ্ন ২: ৫ লাখ টাকার বেশি দেনমোহর হলে সরকারি ফি কীভাবে হিসাব করা হয়?

উত্তর: প্রথম ৫ লাখ টাকার জন্য নির্দিষ্ট ফি ৭,০০০ টাকা। এরপর ৫ লাখ টাকার অতিরিক্ত প্রতি ১ লাখ টাকা বা তার অংশবিশেষের জন্য অতিরিক্ত ১০০ টাকা থেকে ২০০ টাকা (বিধিমালা অনুযায়ী) সরকারি ফি হিসেবে যোগ হয়।

প্রশ্ন ৩: তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ রেজিস্ট্রেশনের সরকারি ফি কত?

উত্তর: বর্তমানে তালাক বা বিবাহ বিচ্ছেদ নিবন্ধনের জন্য সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট ফি হলো ১,০০০ টাকা।

প্রশ্ন ৪: কাজী যদি নির্ধারিত ফি-র চেয়ে বেশি টাকা দাবি করেন, তবে কোথায় অভিযোগ করব?

উত্তর: কাজী যদি সরকারি ফি-র অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন এবং রসিদ দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে আপনি আপনার এলাকার জেলা রেজিস্ট্রি অফিস (জেলা Registrar) অথবা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (UNO) এর কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন।

প্রশ্ন ৫: বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের পর সরকারি রসিদ নেওয়া কি বাধ্যতামূলক?

উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই বাধ্যতামূলক। কাজী সাহেবকে টাকা পরিশোধ করার পর সরকারি সিল ও স্বাক্ষরযুক্ত মূল মানি রসিদ (Money Receipt) বুঝে নেবেন, যেন পরবর্তীতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।

উপসংহার

২০২৬ সালে এসে সরকারি গেজেট অনুযায়ী বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশনের মূল আইনি ফি অপরিবর্তিত বা ধারাবাহিক থাকলেও, উচ্চ দেনমোহর ধার্য করার মানসিকতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কাজীদের অনিয়মের কারণে সার্বিকভাবে বিয়ে ও ডিভোর্সের খরচ আগের চেয়ে বেশি মনে হচ্ছে। সঠিক আইনি তথ্য জানা থাকলে এবং কাজী প্রথা ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতন থাকলে অতিরিক্ত খরচের হাত থেকে সহজেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

Leave a Comment